ভাসমান সবজি চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

অ) যে ভাবেই বলি না কেন। বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতি নির্ভরশীল। এই নদী বিধৌত দেশের অধিকাংশ স্থান জলমগ্ন থাকে। আর বর্ষাকালে তো কথাই নেই, কেবল থৈ থৈ পানি আর পানি। তথ্যমতে জানা যায় যে, দেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চল সহ অনেক জায়গায়ই হাওড়-বাওর, বিল-ঝিল ও নদী-নালায় আচ্ছাদিত। এদিকে সমুদ্রের কাছাকাছি এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে থাকে। সত্যি কথা বলতে কি, এই ধান শালিকের দেশের সিংহভাগ এলাকা বছরের প্রায় ৭ মাস পানি বন্দি থাকে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে জলমগ্ন থাকার কারনে কি কৃষি কাজ হয় না বা করা যাবে না? হাঁ অবশ্যই করা যাবে। এ প্রেক্ষাপটে অন্যতম নিয়ামক ও আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাসমান সবজি (ঋষড়ধঃরহম ঠবমবঃধনষবং) চাষ। এ সূত্র ধরে উল্লেখ্য যে দক্ষিণাঞ্চলের নাজিরপুর, বানারীপাড়া, উজিরপুর, স্বরুপকাঠি, আগৈলঝাড়া প্রভৃতি উপজেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে সবজি চাষ করে চলেছে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক কৃষকরা। এখানে ঢেড়শ, চিচিঙ্গা, পেঁপে, লাউ, কুমড়া, শিম, বরবটি, টমেটো, বেগুন, করলা, ঝিঙ্গা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, সবুজ কপি, ইত্যাদির চারা উৎপাদন সহ কলমি শাক, কচু, পাট শাক, লাল শাক, লাউ শাক, পালং শাক, ডাটা শাকও চাষ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকার হাজার হাজার হেক্টর নিচু জমি কচুরিপানা এবং অন্যান্য জলজউদ্ভিদসহ জলে বন্দি থাকে। কিন্তু জলাবদ্ধতা আর কচুরিপানা অভিশাপ হিসেবে মনে করা হলেও, এখন আর তা নয়। বাস্তবসম্মত কৌশলগত চাষের কারণে পরিণত হয়েছে আশীর্বাদে। যতদূর তথ্যাদি সংগ্রহ করেছি, তাতে প্রতীয়মান হয় যে এই ভাসমান সবজি চাষের পথ চলা শুরু হয় নাজিরপুর থেকে এবং কালক্রমে ধীরে ধীরে এ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, কমবেশি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মজার ব্যাপার হলো যে, এর জনপ্রিয়তা ও আর্থিক দিক দিয়ে গ্রহণযোগ্যতার দিক দিয়ে সরণি ধরে বাংলাদেশের সবজি চাষকে স্বীকৃতি দিয়েছে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (জাতিসংঘ)। তাছাড়া ভাসমান আবাদ ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর গ্লোবাল এগ্রিকালচার হেরিটেজ সিস্টেম সাইট হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে জাতিসংঘ থেকে, যা কম কথা নয়?
আ) সাধারণত এ অঞ্চলের ধানি জমিতে বাংলা অগ্রহায়ণ থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত বোরো ধানের চাষ হয়। এরপর এ সব জমি জ্যৈষ্ঠ থেকে অগ্রহায়ণ মাস ধরে প্রায় ৭ মাস পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। তখন স্থানীয় মানুষের আর কাজ থাকে না। তাই ভাসমান সবজি চাষের মাধ্যমে তাদের দিন ফিরে গিয়েছে। আর কাজ ছাড়া বসে থাকতে হয় না। এই চাষ সামনে রেখে আষাঢ় মাসে কচুরিপানা সংগ্রহ করে স্তূপ করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে জলাভূমিতে কচুরিপানা সহ পর্যায়ক্রমে শ্যাওলা, দুলালীলতা, টোপাপানা, কুটিপানা, কলমিলতা ও নানা জলজ লতা স্তরে স্তরে সাজিয়ে ২ থেকে ৩ ফুট পুরু করে ধাপ বা ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয়। আর ধাপ দ্রুত পচানোর জন্যও সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ ধাপ চাষের উপযোগী করতে ৭ থেকে ১০ দিন ধরে প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রাখতে হয়। আর এই ভাবে সারা বছরের প্রয়োজনীয় জোগান নিশ্চিত করে রাখা হয়। একেকটি ভাসমান ধাপ বা বেড বা কান্দি ৫০ থেকে ৬০ মিটার লম্বা ও দেড় মিটার প্রশস্ত এবং ১ মিটারের কাছাকাছি পুরু থাকে। এইভাবে উঁচু বীজতলা তৈরি করে তার উপর কচুরিপানা ও বর্ণিত জলজ উদ্ভিদ স্তরে স্তরে সাজিয়ে নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া ও ক্ষুদ্রাকৃতির বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ পচিয়ে বীজতলার উপর ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং এখানে বীজ বপন করে উৎপাদন করা হয় বিভিন্ন প্রজাতির শাক-সবজি এবং দৌলা বা মেদাব মাধ্যমে সাজানো চারা। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে ভাসমান (ধাপ) পদ্ধতিতে সরাসরি বীজ বপন করা সম্ভব হয় না বিধায় বীজ বপন করে চারা তৈরীর জন্য পৃথক এক ধরনের আধার তৈরী করা হয়, যা স্থানীয় ভাষায় বলা হয় দৌলা বা মেদা। এক্ষেত্রে পচা কচুরীপানা, দুলালী লতা, বাঁশের কঞ্চি ও নারিকেল ছোবড়া গুড়ার সাহায্য নেয়া হয়। আর দৌলা তৈরির কাজটি সাধারনত মেয়েরা করে থাকে। সত্যি কথা বলতে কি, এই ভাসমান ধাপে স্বল্প জীবনকাল সম্বলিত বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করা হয়ে থাকে। সাধারনত একটি ধাপের মেয়াদকাল কম বেশি ৩ মাস। এদিকে ধাপে অঙ্কুরিত চারা পরিপক্ব চারায় পরিণত হয় মাত্র ২০ থেকে ২২ দিনে। অবশ্য পুনরায় ব্যবহার করার জন্য ধাপগুলোর সামান্য পরিবর্তন করতে হয়। আর ৫ থেকে ৬ দিন পরপর ভাসমান ধাপের নিচ থেকে কচুরিপানার মূল বা শ্যাওলা টেনে এনে দৌলার গোড়ায় বিছিয়ে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে বাড়তি জীবনের সঞ্জিবনী শক্তি পায় এখান থেকে। তৎপর তরতর করে চারাগুলো বেড়ে উঠে। অবশ্য এজন্যে করতে হয় নিয়মিত পরিচর্যা। এর মধ্যে প্রতিদিন ধাপে হালকা করে পানি সেচ দেয়া হয়, যাতে করে চারার গোড়া শুকিয়ে না যায়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, একটি অঙ্কুরিত বীজ বীজতলায় রোপণ করার ২০ থেকে ২২ দিনের মাথায় পূর্ণবয়স্ক চারায় রূপান্তরিত হয়। আর এক সপ্তাহের মধ্যে পাইকারি ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান এসব চারা। উল্লেখ্য যে জৈবসারে উৎপাদিত এসব চারার উৎপাদন খরচ পড়ে এক থেকে দেড় টাকা এবং এক হাজার চারা আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়। এদিকে শাকসবজি বড় হলে চাষিরা ধাপ থেকে তুলে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন। অনেক সময় পুরনো ধাপ কিনে কৃষকরা এর স্বল্প জীবনকালীন বিভিন্ন শাকসবজির আবাদ করেন। তাছাড়া পানি কমে গেলে এসব ধাপ মাটির সাথে মিশে জৈবসার হিসেবে মাটির উর্বরা শক্তি বাড়ায়।
(ই) মূলত দক্ষিন বাংলায় ভাসমান সবজি চাষের কার্যক্রম তুলনামূলক বেশী। এ সূত্র ধরে উল্লেখ্য যে, নাজিরপুর, বানারীপাড়া উপজেলার দেউলবাড়ী দোবড়া ও মালিখালী, পদ্মডুবি, বিলডুমুড়িয়া, বেলুয়া, মনোহরপুর, মুগারঝোর, গাঁওখালী, বৈটাকাঠা, সাচিয়া, চিথলিয়া, কলারদোয়ানিয়া, যুগিয়া, গাওখালী, সোনাপুর, মেদা, পুকুরিয়া, পেনাখালী, মিঠারকুল, পদ্মডুবি, বিলডুমুরিয়া, গজারিয়া চামী ও গগন, প্রভৃতি এলাকায় ভূপ্রকৃতিগতভাবে অঞ্চলভেদে জলাভূমিতে বাণিজ্যিকভাবে ভাসমান ধাপের উপর শাকসবজির উৎপাদন হয়। এদিকে নাজিরপুরের পাশাপাশি বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি, মরিচবুনিয়া, উমারেরপাড়, কদমবাড়ী, মলুহারসহ বিভিন্ন গ্রামের জলাভূমিতে ব্যাপকহারে এই ধাপের মাধ্যমে চাষ হচ্ছে। এছাড়া গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া বর্নীর বিল, চান্দার বিল ও কোটালীপাড়ার বাইগ্যারবিলে এ পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। এতদ্ব্যতীত সুনামগঞ্জ, চাঁদপুর ও নেত্রকোনার বিস্তৃত অঞ্চল তো রয়েছেই। শুধু তাই নয়, সুদূর উত্তর বঙ্গেও এই চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে গাইবান্ধা জেলার কথাই ধরা যাক। বর্তমানের এই জেলার সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের ঝাড়াবর্ষা বিলে ভাসমান বেডে সবজি চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এগিয়ে এসেছে। প্রথমদিকে কৃষকরা সন্দিহান থাকলেও এখন সফলতা আসায় সংশ্লিষ্ট সকল এলাকায় উৎসাহ অনেক বেরে গিয়েছে। এদিকে গাইবান্ধাসহ উত্তরের আরও ১১টি জেলায় এই পদ্ধতিতে চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে এনজিওদের ভূমিকা প্রনিধানযোগ্য। বস্তুত ভাসমান সবজি চাষ বলতে গেলে রেঁনেসার ন্যায় দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে উল্লেখ্য যে এক দশক আগে ভাসমান বেডে সবজি ও চারা উৎপাদন হতো মাত্র ৫০ থেকে ৭০ হাজার টন। এখন তা দেড় লাখ টন অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে বরিশাল ও পিরোজপুরের “মডেল” দেশের ২৪টি জেলায় সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এটা সত্য যে বর্ষা মৌসুমে, বিশেষ করে কোন এলাকা বন্যা কবলিত হলে, সেক্ষেত্রে সবজি ও চারার বড় অবলম্বন হলো ভাসমান চাষ পদ্ধতি। মজার ব্যাপার হলো যে, ঢাকা রাজধানীর সমুদয় ছাদ বাগানের বাহারি চারার যোগান আসে এ এলাকা থেকে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে দেশের ৪৫ লাখ হেক্টর স্থান জল সীমার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ জমিতে যদি ভাসমান সবজির আবাদ করা যায়, তাহলে দেশের সবজি ও মসলা উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এদিকে পরিবর্তিত জলবায়ুর ক্ষেত্রে পরিবেশ বান্ধব ও সহায়ক হলো এই ভাসমান সবজি চাষ। তাছাড়া বন্যা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসেও তেমন ক্ষতির আশংকা নেই। আর যদি সেইভাবে উদ্যোগ নেয়া যায়, তাহলে এখনকার উৎপাদিত চারা আশে-পাশের দেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে। তাছাড়া ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নতুন মাত্রায় যোগ হয়েছে। এই কারনে আগের অনাবাদী জমির মূল্য ও কদর বেড়েছে। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য যে সংশ্লিষ্ট চাষীরা নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠার পাশাপাশি অন্যদেরকেও প্রকারান্তরে স্বাবলম্বী করার পথ খুলে দিয়েছেন। কেননা সবজি ও চারা কেনা-বেচা এবং পরিবহনের সুবাদে কয়েক লাখ লোকের জীবিকার পথ সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয় সৌন্দর্যের দিক দিয়েও কম নয়। সারি সারি এসব ভাসমান ধাপের অপরূপ সৌন্দর্য বাঙ্গালী মনে বাড়তি হিল্লোল বয়ে আনছে বললে অতূক্তি হবে না।
পরিশেষে বলতে চাই যে, এই পরিবেশ বান্ধব ভাসমান সবজি প্রযুক্তি আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওরের দেশে সত্যি আশীর্বাদ স্বরুপ এবং আগামী দিনের আলোক বর্তিকা। তাই এই পটেনশিয়াল কার্যক্রমকে আরও প্রসার এবং অর্থবহ করে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ের লোকদের অংশীদারত্বের আদলে বিভিন্ন আঙ্গিকে তৎপর সহ এগিয়ে আসতে হবে।