কমিন্টমেন্ট থাকলে যে কোন সাহিত্যিক সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখতে পারেন: জাহানারা তোফায়েল

জাহানারা তোফায়েলেরে লেখালেখি শুরু শৈশব থেকেই। তিনি দীর্ঘকাল লিবিয়া, সৌদি আরব ও পাকিস্তানে প্রবাস জীবন যাপন করলেও সাহিত্য চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি প্রায় তিন বছর বাংলা লিবিয়া স্কুলে শিক্ষকতা করনে। জাহানারা তোফায়েলের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে; রোড ঝলমলে দিন, আটপৌরে গল্প, আমারে তুমি চিনবে না, আকাশ যখন কৃষ্ণচুড়া, ছড়ায় ছড়ায় সারাবেলা, ছড়ার খোঁজে রওনা দিলাম ও ছোট হোটেলের বার্বুচি। তাঁর প্রত্যেকটি গ্রন্থ অত্যন্ত সুখপাঠ্য, সহজবোধ্য ও সাহিত্যমূল্য বিচারে মানোত্তীর্ণ। লেখিকা জাহানার তোফায়েল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স শেষ বর্ষ অধ্যায়নকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ডাঃ তোফালে আহমেদ এর সঙ্গে বিবাহ বিন্ধনে আবদ্ধ হন।
সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ কবি সংগঠন থেকে শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০০৪ লাভ করেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনে গুনীজন সম্মাননা ক্রেষ্ট এবং কবিতা আবৃত্তি বৃত্তান্ত পুরস্কার ২০০৪ পেয়েছেন। শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য নজরুল সম্মাননা পদক ২০০৫ লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু পুরস্কার ও ড. আশরাফ সিদ্দিকী পুরস্কার, ধারা স্বর্ণ পদক ছাড়াও তিনি বিশটির অধিক পুরস্কার লাভ করেন।
তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঁয়ত্রিশটি। বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী কবি জাহানার তোফায়েল সম্প্রতি দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সাহিত্যের নানাদিক নিয়ে আলোচনা করেন। সাহিত্য চর্চার সূচনালগ্নের কথা জানতে চাইলে কবি জাহানারা তোফায়েল বলেন, আমাদের পরিবারেই সাহিত্যের আবহ বিরাজমান ছিল, আমার ভাই-বোনেরাও সাহিত্য চর্চার সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম সুতরাং পারিবারিক পরিবেশে ও উৎসাতেই সাহিত্য চর্চা শুরু করি। যার সাধানায় আজ অবদি রয়েছি। সাহিত্যের কোন কোন শাখায় আপনার বিচরণ রয়েছে এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছড়া, কবিতা ও গল্প সমানতালে লেখালিখি করছি। গুরাটা হয়েছিল ছড়া কবিতা দিয়েই। ছোট গল্প নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাছাড়া কবিতার পাঠক প্রিয়তা খুবই কম, সেক্ষেত্রে গল্প ব্যাপক জনপ্রিয়। ছোট গল্পের ব্যাপারে পাঠকের আগ্রহও বেশি। কবিতায় পদ্মরীতি গদ্মরীতি সম্পর্কে এই কবি বলেন, আমি উভয় রীতিতেই কবিতা লেখি। কবিতা লেখার ক্ষেত্রে গৎবাধা নিয়মে আমি অভ্যস্ত নই। আগে অবশ্য পদ্মরীতি অর্থাৎ অন্তমিলের কবিতারই বেশী প্রচলন ছিল এখন আবার গদ্মরীতি বা ফ্রীভার্স কবিতার চর্চা বেশী। বর্তমানে ফ্রীভার্সই জনপ্রিয় হয়ে গেছে। আমি অবশ্য সমান তালে অন্তমিলের ও ফ্রীর্ভাস কবিতা লিখে থাকি। সাহিত্য চর্চার উদ্দেশ্য কি হওয়া উচিত এমন এক প্রশ্নের জবাবে বরেণ্য এই কবি বলেন, যা খুশি তা লেখাই সাহিত্য নয়, শিল্পের জন্যে শিল্প বা সাহিত্যের জন্য সাহিত্য চর্চা-এমন নীতি সঠিক নয়। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে মানবকল্যাণ কামিতা থাকতে হবে। এটা চিন্তার প্রকাশ ও চিন্তার বিনিময়য়ের বিষয়। একজন সাহিত্যিকের চিন্তা চেতনায় সমাজের কল্যাণ সাধিত হবে। সকল সাহিত্য কর্মের একটি সুনির্দিস্ট মেসেজ থাকতে হবে। বর্তমানে পাঠক কবিতা বিমূখ কেন এই বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে প্রতিভাবান এি কবি বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরেও আছে। কেননা, কবিতার বই তেমন একটা বিক্রি হয়না, প্রকাশকরাও কবিতার বই প্রকাশ করতে আগ্রহী হয় না। পাঠক কবিতা যে পছন্দ করেনা এমন নয়। ভাল কবিতা পাঠক এখনো পড়তে চায়। এখানে লেখকেরও দায় আছে। বর্তমানে কবিতা যে ষ্টাইলেই লেখা হোক না কেন অধকাংশ ক্ষেত্রেই তাতে সুনির্দিষ্ট কোন মেসেজ থাকে না। যে কারণে পাঠক হয়তো কবিতার শক্তি অনেক। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে কম নয়। একটি কবিতার বাণীই সমাজের ভীত নড়িয়ে দিতে পারে। সমাজের আমুল পরিবর্তন করতে পারে। রাজনীতির হিসাবও পাল্টে দিতে পারে। সে রকম কবিতার এখন অনেক অভাব।
সাহিত্যিকে চর্চার ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস কি কেউ আছেন- এমন প্রশ্নের জবারেব কথা সাহিত্যিক জাহানারা তোফায়েল বলেন, আগেই বলেছি আমাদের পরিবারই সাহিত্য চর্চার প্রেরণা যুগিয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও তারা শংকর আমার সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যোগায়। সমাজ সংস্কারে সাহিত্যের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গুনী এই কবি বলেন, সমাজ সংস্কারে, সমাজের পরিবর্তনে সাহিত্যের ভূমিকা অতিতে ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। এ ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে আমরা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আইকন হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। নজরুলের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, বৃটিশ শাসকদের ক্ষমতার মসনদ কাঁপিয়ে তুলেছিল। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর সাহিত্য কর্ম অস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। কমিন্টমেন্ট থাকলে যে কোন সাহিত্যিক সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখতে পারেন।
আমাদের সমাজে পাঠ অভ্যাস না থাকার কারণ কি জানতে চাইল কবি বলেন, এখানে পরিবার একটি বড় ফ্যাক্টর। কারণ শিশুরা পরিবার থেকেই পাঠের উৎসাহ ও প্রেরণা পায়। আমরা পারিবারিকভাবেই শিশুদের একাডেমিক পাঠের প্রতি মনোযোগী রাখি। একাডেমিক পাঠের পাশাপাশি বাহ্যিক জ্ঞান চর্চায় শিশুদের অভ্যস্ত রাখলে পাঠ অভ্যাস গড়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে পাঠাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।