বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১০:৫৫ অপরাহ্ন
Notice :
পরীক্ষামূলক আয়োজন চলছে। শীঘ্রই আসছি পূর্ণাঙ্গরূপে।

ইউনানী-আয়ুর্বেদ ঔষধে সিলডেনাফিল ডেক্সামেথাসন!

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১১১ Time View
Update : বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৩
Composition of natural alternative medicine with capsules, essence and plants on wooden table in rustic kitchen. Front view. Horizontal composition.

অতি মুনাফার জন্যে ভেষজ বাদ দিয়ে ইউনানী-আয়ুর্বেদ ঔষধে কেমিকেল ব্যবহার হচ্ছে দেদারসে। ফর্মূলারী অনুযায়ী নির্ধারিত ভেষজ উপকরনের পরিবর্তে মাত্রাতিরিক্ত নানা ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহৃত হচ্ছে। ডেক্সামেথাসন সমেত প্রস্তুত ঔষধ সেবনে মানুষ মোটাতাজা হচ্ছে ঠিকই কিন্ত কিডনি জটিলতা সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যদিকে সিলডেনাফিল সমেত তৈরি ঔষধ সেবনে অতিরিক্ত যৌন উত্তেজনায় উচ্চ রক্তচাপে তাৎক্ষণিক মৃত্যু সহ হার্ট এটাকের ঘটনা ঘটছে।
সূত্রমতে, দেশে লাইসেন্স প্রাপ্ত ইউনানী ঔষধ কোম্পানী-২৬৬টি এবং আয়ূর্বেদ ঔষধ কোম্পানী ২০৫টি। এরমধ্যে ঐতিহ্যবাহি কিছু কোম্পানী ফর্মুলারি অনুযায়ি ঔষধ তৈরি করলেও বেশিরভাগ কোম্পানীই ফর্মূলারির বাইরে গিয়ে অতি মুনাফার জন্যে নানা ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করছে। ফলে মানব স্বাস্থ্য চরম হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। পেশাদার ডিগ্রীধারী হাকিম কবিরাজদের স্থান দখল করেছে কেমিষ্টরা। যারা হার্বসের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কেমিক্যাল ব্যবহারের নিয়ম বাতলিয়ে থাকেন।এখন অনেক হাকিম কবিরাজও কেমিক্যাল বিদ্যা রপ্ত করে অসৎ কাজে লিপ্ত হয়েছে।
স্বার্থান্বেষী কিছু ব্যবসায়ী ও হাতুরে বৈদ্যদের অনুপ্রবেশের ফলে এই শিল্পে এত জাল জালিয়াতি। ইউনানী-আয়ুর্বেদ ঔষধ শিল্প ভ্যাট মুক্ত হওয়ায় ও স্বল্প পুজিঁতে ব্যবসা করা যায় বলে অসৎ ব্যবসায়ী ,হকার,হাতুরে বৈদ্য সবাই হুমরি খেয়ে পড়েছে। এক ব্যক্তি একাধিক কোম্পানীর মালিক। চিকিৎসার নামে প্রতারনার অভিযোগে র‌্যাবের হাতে আটক হওয়া ব্যক্তিও এখন লাইসেন্স প্রাপ্ত কোম্পানির মালিক! এককালের হকারও এখন শিল্প সমিতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একজন পল্লী চিকিৎসকও তিনটি ঔষধ কোম্পানীর মালিক। দিচ্ছেন শিল্প সমিতির নেতৃত্ব। শহরের শিক্ষিত সমাজে তাদের ঔষধ বিক্রি হয়না ।তাদের টার্গেট গ্রামের অশিক্ষিত মানুষ ও ফুটপাত,বস্তির অসচেতন মানুষ ও পতিতালয়ের খদ্দের। এসব কোম্পানীর ভেজাল যৌন উত্তেজক ঔষধ সেবন করে দৌলতদিয়া পতিতালয়ে অনেক খদ্দেরের মৃত্যু হয়েছে। ঔষধ আইনে এম এল এম ও হকারি করে ঔষধ বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও কিছু ইউনানী-আয়ুর্বেদ কোম্পানী এমএলএম সিসটেমে ও হকারি করে ফুটপাতে ঔষধ বিক্রি করে। এমনকি ফুটপাতে ইদুর মারার ঔষধ বিক্রেতার কাছেও ইউনানী -–আয়ূর্বেদ ঔষধ বিশেষ করে যৌন শকিÍ বর্ধক ঔষধ পাওয়া যাচ্ছে।
ইতিপূর্বে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরনের অভিযোগে ঔষধ প্রশাসন কর্তৃক কিছু কোম্পানীর কারখানা সিলগালা করে দেয়া হয়েছিল। তারাও আবার কারখানায় উৎপাদন শুরু করেছে।
অন্যদিকে ইউনানী-আয়ুর্বেদ কোম্পানির নাম ও ঔষধের ট্রেড নামেও মানুষ বিভ্রান্ত হয়।এসব কোম্পানি নামের সাথে ফার্মাসিটিক্যালস যোগ করায় সাধারন মানুষ এলোপ্যাথিক কোম্পানি বুঝে ভুল করে।চতুর কোম্পানিগুলো ঔষধের মোড়কে খুব ছোট করে ইউনানী আয়ুর্বেদ লিখে রাখে।সম্প্রতি ঔষধ প্রশাসন এসব কোম্পানির নামের সাথে ফার্মাসিটিক্যালস ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।কিন্ত অধিকাংশ কোম্পানি এই আদেশ পালন করছে না।রয়েছে ট্রেড নামের সমস্যা।এধরনের কিছু কোম্পানি রীতি অনুযায়ী চন্দনাসব,অর্জুনারিস্ট,তিলাযাদিদ,হাব্বে নিশাত এরকম ট্রেডনাম ব্যবহার না করে হরমো প্লাস, গ্রিন প্লাস,পাওয়ার-৩০ এর মত ইংরেজি ট্রেডনাম ব্যবহার করায় জনসাধারন এটাকে এলোপ্যাথিক ঔষধ মনে করে বিভ্রান্ত হয়। ট্রেডনামের ক্ষেত্রে ইউনানী আয়ুর্বেদ ঐতিহ্য অনুসরন করা উচিত বলে সংশ্লি®টগণ মনে করেন।
ঔষধের দাম নির্ধারনের ক্ষেত্রে অরাজকতা বিরাজ করছে। ভেজাল ঔষধ কোম্পানিগুলো তাদের সস্তায় তৈরি ঔষধ বিক্রেতাদের ৫০ থেকে ৮০ ভাগ কমিশন দিয়ে বিক্রি করে! বিশেষজ্ঞদের মতে ৫০ বা ৮০ ভাগ কমিশনে বিক্রয় করা ঔষধে হার্বস ব্যবহার সম্ভব নয়। রং,পানি,স্যাকারিন ও কেমিকেল যোগে তৈরি হলেই এটা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে ইউনানী-আয়ুর্বেদ কোম্পানির বিক্রয় কমিশন এলোপ্যাথিক কোম্পানির সমান্তরাল হওয়া উচিত।
বর্তমানে ইউনানী আয়ূর্বেদ ঔষধ শিল্পে বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে সিলডেনাফিল সাইট্রেড ও ডেক্সামেথাসন সালফেট। বর্তমান যুগে অবশ্য যৌনশক্তি বর্ধক ঔষধের ব্যবসা তুঙ্গে। ইউনানী আয়ূর্বেদের যৌনশক্তি বর্ধক ঔষধ দীর্ঘ মেয়াদে খুবই কার্যকর। যার কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু অসচেতন মানুষ দীর্ঘ মেয়াদের সমাধানের পরিবর্তে ত্বরিত সমাধানের দিকে ঝুকছে। আর সমাধানের নাম- সিলডেনাফিল সাইট্রেড এর মত কেমিক্যাল। এই কেমিক্যাল যোগে তৈরী ঔষধ যৌন সক্ষমতায় ত্বরিত কাজ করলেও দীর্ঘ মেয়াদে মানব দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নানা ক্ষতি করে। এক পর্যায়ে যৌন ক্ষমতা সম্পূর্নরূপে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তারপরও যৌনশক্তি বর্ধক ঔষধের ব্যবসা এখন রমরমা। অন্যদিকে মোটা হওয়ার ঔষধে ব্যবহার হচ্ছে ডেক্সামেথাসন সালফেট। ইউনানী-আয়ুর্বেদ ঔষধ শাস্ত্রের ইমেজ ও মানব স্বাস্থ্যের হিতাহিত চিন্তা না করে কতিপয় ইউনানী-আয়ুর্বেদ ঔষধ কোম্পানীর মালিক এই রমরমা ব্যবসায় গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। অনুসন্ধানে জানাগেছে,কেমিক্যাল ব্যবহারকারী কোম্পানীর ব্যবসা রমরমা। অনেক হকার ও হাতুরে বৈদ্য কোম্পানির মালিক হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে গেছে। মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে হয়েছে টাকার কুমির ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌনশক্তি বর্ধক ঔষধ তৈরীর জন্য সরকার স্বীকৃত ইউনানী-আয়ুর্বেদ ফর্মূলায় একাধিক রেসিপি রয়েছে। আয়ূর্বেদ ফর্মূলারীতে অন্যতম রেসিপি হচ্ছে যৌবন শতদল (বাজী করনাধিকার), যৌবন শতদল রেসিপির ১৫টি উপকরন হচ্ছে- রস সিন্দুর, স্বর্ণ, মুক্তা, বঙ্গ, অশ্বগন্ধা, আলকুশি, আকর করভ, জাফরান, যায়িত্রী, লবঙ্গ, শুঠ, পিপুল, রক্ত চন্দন, অহিফেন। অন্যা রেসিপির উপকরন প্রায় কাছাকাছি। অন্যদিকে ইউনানী ফর্মূলারীর একাধিক রেসিপির মধ্যে হাব্বে-নিশাত অন্যতম। হাব্বে নিশাত রেসিপির ৯টি উপকরন হচ্ছে- বিস্বাহা, রেগমাহী, সমুন্দর সুখ, জৌযবুওয়া, কুশত্ নুক্রা, জাফরান, যহর মোহরা, জুন্দবেদস্তর ও আবে বর্গে তাম্বুল। অন্যান্য ইউনানী রেসিপির উপাদান প্রায় অভিন্ন। কিন্তু মুনাফাখোর বিপদগামী ব্যবসায়ীরা উপরোক্ত রেসিপির উপকরনের পরিবর্তে ব্যবহার করে সিলডেনাফিল সাইট্রেড কেমিক্যাল। যদিও ঔষধের লেবেল কার্টূনে ইউনানী-আয়ুর্বেদ রেসিপির উপকরন লেখা থাকে। জাল জালিয়াতি বা অন্য কোন উপায়ে ঔষধ প্রশাসন থেকে অনুমোদন নিয়ে থাকে
বিশ্লেষকদের মতে, যৌনশক্তি বর্ধক ঔষধ যদি ইউনানী আয়ুর্বেদ ফর্মূলায় তৈরী হয় তাহলে কার্যকারিতা পাওয়া যাবে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর এবং যা টেকসই। আর যদি ঔষধের কার্যকারিতা এক থেকে তিন ঘন্টার মধ্যে হয় তাহলে বুঝতে হবে এটা ইউনানী আয়ূর্বেদ ঔষধ নয়। আর বাকিটা নিশ্চিত হওয়া যাবে ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষার পর। অবশ্য মাঠ পর্যায় থেকে ঔষধ তুলে এনে ঔষধ প্রশাসন পরীক্ষা করেছে এমন নজীর বিরল।
তবে ঔষধ প্রশাসন ও ভেজাল ঔষধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে চোর-পুলিশ খেলা হয় , লেনদেনে কোন সমস্যা হলে ল্যাবরেটরীতে ঔষধ পরীক্ষা করে কোম্পানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে জালিয়াত কোম্পানী গুলো শঠতার আশ্রয় নেয়, বলে এই ঔষধ আমাদের উৎপাদিত নয়; কোন জালিয়াত চক্র আমাদের নামে ঔষধ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে।
অনেক কোম্পানীর যৌনশক্তি বর্ধক ঔষধের ব্যবহারিক পরীক্ষায় প্রমানিত হয় এগুলো ইউনানী-আয়ুর্বেদ ফর্মুলায় তৈরি নয়।কেননা,উক্ত ঔষধ সমুহের কার্যকারিতা শুরু হয় এক থেকে দুই ঘন্টার মধ্যে।যা ভেষজ ঔষধের বৈশিষ্ট নয়। কিছু কোম্পানির ঔষধ নির্দেশিকায় লেখা রয়েছে প্রযোজনের এক ঘন্টা পুর্বে সেবন করতে হবে ।উল্লেখিত ঔষধগুলোর বিক্রেতাদের(ফুটপাত ও ঔষধের দোকান) সাথে কথা বললে তারা সেবনের ১ ঘন্টার মধ্যে কার্যকারিতার নিশ্চয়তা দেন।অন্যদিকে একাধিক ব্যবহারকারী ১ থেকে ৩ ঘন্টার মধ্যে কার্যকারিতার কথা স্বীকার করেছেন।তবে উক্ত ঔষধ দীর্ঘ দিন ব্যবহারের ফলে শরীরে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাবের কথাও বলেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, তাদের নিজস্ব উদ্যোগে ল্যাবরেটরীতে ইউনানী-আয়ুর্বেদ ঔষধের কিছু নমুনা ইতিপূর্বে পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে ফর্মূলারী বহির্ভূত রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের প্রমান পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসনের নিজ উদ্যেগে মাঝেমধ্যে বাজার থেকে ঔষধের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবেটরিতে পরীক্ষা করে কিন্ত ভেজাল প্রমানিত হলেও অভিযুক্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে রহস্যজনক কারনে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করছে না। এমতাবস্থায় জালিয়াত কোম্পানির কারখানায় ও বিক্রয় কেন্দ্রে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা , বাজার থেকে ঔষধের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং অভিযুক্ত কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টগণ ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর