বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ১১ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ২৭২ কোটি টাকা করা হয়েছে। অবশ্য এই বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
বাজেট বিবরণ অনুযায়ী, দেশে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতের আওতায় ১২৩টি কর্মসূচি রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এগুলোর মধ্যে ৮টি কর্মসূচি হচ্ছে নগদ ভাতা এবং ১১টি খাদ্য সহায়তা। আসন্ন বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক কল্যাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসৃজন, অবসর ও পারিবারিক ভাতা এবং অন্যান্য এই মোট ছয় খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। চলতি বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অবশ্য বিগত বাজেটে এ খাতে ১৮ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সে হিসাবে বরাদ্দ বেড়েছে ৫৭০ কোটি টাকা। খাদ্য নিরাপত্তায় ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি রয়েছে। চলতি বাজেটে সামাজিক কল্যাণ খাতে ৩৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
বিগত বাজেটে ৩২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা রয়েছে। এ খাতের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, বেদে, হিজড়া, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করা হয়। চলতি বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নে ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বিগত বাজেটে ছিল ৫ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা উপবৃত্তি, প্রাথমিক ছাত্রছাত্রী উপবৃত্তি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তিতে এ টাকা খরচ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসৃজন খাতে নতুন বাজেটে ১৯ হাজার ৭০০ কোটি বরাদ্দ করা হয়েছে। বিগত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা। কাবিখা, উন্নয়ন প্রকল্প বা কর্মসূচিতে এই বরাদ্দের টাকা ব্যয় হয়। অবসর ও পারিবারিক ভাতায় নতুন বাজেটে ২৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এখাতে বিগত বাজেটে রয়েছে ২৬ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। বয়স্ক, বিধবা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, মাতৃত্বকালীন ভাতা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি দিতে এ টাকা ব্যয় হবে। তাছাড়া নতুন বাজেটে ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আর বিগত বাজেটে এ খাতে ৪ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আওতা বেড়েছে কেবল বয়স্ক ও বিধবাদের ক্ষেত্রে। এই কর্মসূচির আওতায় নতুন আরো ১০০ উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যুক্ত হবে ১১ লাখ নতুন উপকারভোগী। নতুন বাজেটে এর মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৮ লাখ। কিন্ত ভাতার পরিমাণ বাড়বে না। এ কর্মসূচির আওতায় গত তিন অর্থবছর ধরে উপকারভোগীরা প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন।
অন্যদিকে প্রতিবন্ধীদের জন্য ৭৫০ টাকা করে ভাতা ছিল গত অর্থবছরে।চলতি অর্থবছর থেকে ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে। বিগত অর্থবছরে ২০ লাখ ৮ হাজার প্রতিবন্ধীর জন্য ভাতা বরাদ্দ ছিল। উপকারভোগীর সংখ্যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫৭ হাজার বাড়িয়ে ২৩ লাখ ৬৫ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। নতুন অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ভাতা বাবদ ২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এদিকে শহর ও গ্রাম মিলিয়ে ৭ লাখ ৭০ হাজার দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং ২ লাখ ৭৫ হাজার কর্মজীবী মায়ের জন্য ভাতা দিয়ে আসছে সরকার। দুটি কর্মসূচিকে এক করে চলতি অর্থবছর থেকে নতুন নাম দেওয়া হচ্ছে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’। ২০২১-২২ অর্থবছরের এ কর্মসূচিতে মোট উপকারভোগীর ১০ লাখ ৪৫ হাজার থেকে ২ লাখ ৯ হাজার বৃদ্ধি করে চলতি অর্থবছরে ১২ লাখ ৫৪ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। এ খাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার পরিমান বাড়ানো হয়নি। ২০২১-২২ অর্থবছর হতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানি ভাতা ন্যূনতম ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
উপরোক্ত বাজেট পর্যালোচনায় সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে বটে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির মাধ্যমে পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠির কল্যানে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠির প্রয়োজনের তুলনায় এ বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। বিদ্যমান বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হলেও তা পর্যাপ্ত হবে না। তারপর বরাদ্দের অপব্যবহার তো রয়েছে। কাগজে বরাদ্দ পায় আছিয়া আর মোটা হয় মাফিয়া। অর্থাৎ মূল উপকারভোগিরা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়। স্বামি জীবিত অথচ অনৈতিক প্রক্রিয়ায় নাম অন্তর্ভূক্ত করে বিধবা ভাতা নেয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিত্তহীনের বরাদ্দ বিত্তবানের নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
অনুন্নত, স¦ল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রগুলোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মত মৌলিক অধিকার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই যথাযথভাবে পূরণ করতে পারে না। গণতন্ত্র, সুশাসনের অভাবে দেশে দূর্নীতি চরম আকার ধারণ করেছে। দূর্নীতির কারণে সম্পদ একটি বিশেষ শ্রেনী গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জিভ’ত হচ্ছে। ফলে ধনী-গরীবের ব্যবধান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, গরীব ক্রমান্বয়ে গরীব হচ্ছে আর বিশেষ শ্রেনী ফুলে ফেপে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিনত হচ্ছে। তাছাড়া সমাজের অসহায় শ্রেনী তথা পঙ্গু, অনাথ, বৃদ্ধদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহনের সুযোগ থাকেনা। এই অসহায় শ্রেনীর জন্যই প্রধানত রাষ্ট্র নিরাপত্তা কর্মসূচী গ্রহণ করে। বাংলাদেশ সরকারও অসহায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির জন্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী গ্রহণ করে। তবে তা একদিকে যেমন পর্যাপ্ত নয় অন্যদিকে সঠিকভাবে ব্যবহারও হয় না। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার জন্যে বরাদ্দকৃত অর্থের বেশীর ভাগই লোপাট হয়। প্রকৃত উপকারভোগী বাদ পড়ে যায়।
সরকারের কাবিখা ,কাবিটার মত কর্মসূচীগুলো খুব একটা কাজে আসেনা। অতীব জরুরী বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা তো এখন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। সমাজে ৯০-১০০ বছর বয়স্করা বৃদ্ধ ভাতা পায়না। রাজনৈতিক বিবেচনা বা ঘুষ কালচারের কারণে সামার্থ্যবান যুবকরাও নাকি বয়স্ক ভাতা পায়। বিধবা ভাতার হাল অনুরূপ। অভাবী অসহায় বিধবা মহিলারা ঘুষ দিতে না পারায় বা দলীয় অনুগ্রহ না থাকায় বিধবা ভাতা পাচ্ছেনা। অনুরূপ অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর প্রকৃত ষ্টেকহোল্ডারও বাদ পড়ে যাচ্ছেন দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ক-ুরাজনীতির কারনে।
বাংলাদেশে দারিদ্রের হার অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী খুবই অপ্রতুল্ ।একদিকে কর্মসূচী সীমিত আবার অর্থ বরাদ্দও অপর্যাপ্ত। অন্যদিকে বরাদ্দকৃত অর্থের সিংহভাগ হয় লোপাট। দেশের মানুষ কি রকম অভাবে আছে, তা যাকাত আনতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মরার দৃশ্য দেখে সহসাই অনুমান করা যায়।
নিরাপত্তা কর্মসূচী বৃদ্ধি বা অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না তা যথাযথভাবে ব্যয় হতে হবে। কর্মসূচী গ্রহন করতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
সমাজে সবেচেয়ে অসহায় মানুষ হচ্ছে অনাথ শিশু, বৃদ্ধ ও পঙ্গুরা। অন্ধ, লেংরা সহ শারীরিক বিকলাঙ্গ মানুষের কর্মক্ষমতা থাকেনা । তাই তাদের অন্যের উপর ভরসা করতে হয়। আবার মাতৃ-পিতৃহীন অনাথ শিশুরা একেবারেই অসহায় যেমন অসহায় বৃদ্ধরা। অথচ তাদের জন্যে বলতে গেলে টেকসই কোন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী নেই।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীতে প্রধানত অগ্রাধিকার দেয়া উচিত পঙ্গুদের। দেশের শারীরিক বিকলাঙ্গ মানুষদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের মাসিক ভাতা দেয়া যেতে পারে বা আয়বর্ধক কোন প্রকল্পের আওতায় আনা যেতে পারে। পঙ্গুদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় আনা গেলে পথে ঘাটে ভিক্ষুকের উপদ্রব দেখা যাবে না। অনাথ শিশুদের ভরন পোষণের জন্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীতে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। অনাথ শিশুদের মাসিক ভাতা দেয়া যথেষ্ঠ নয় । দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক অনাথ আশ্রম তৈরি করতে হবে, পথ শিশুদের তুলে নিয়ে আশ্রমে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আশ্রয়ের সকল খরচ সরকার কে বহন করতে হবে। এই কর্মসূচি গ্রহন করলে রাস্তায় টোকাই বা পথ শিশুর অস্তিত্ব থাকবেনা। অনুরূপ বৃদ্ধ ভাতার ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হবে। অসহায় বৃদ্ধদের মাসে মাসে কয়েক টাকা ভাতা দেয়া যথেষ্ঠ নয়। সরকারী উদ্যোগে বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সেখানে বৃদ্ধদের আশ্রয় দিতে হবে। সকল খরচ সরকারকেই বহন করতে হবে। উপরোক্ত প্রস্তাবনা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর অন্তর্ভূক্ত করা হলে নিরাপত্তা কর্মসূচী জনগনের কাজে আসবে। সঠিক পরিকল্পনা নিলে, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে পারলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেই বড় আকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী গ্রহণ করা সম্ভব। এজন্যে বিদেশী ঋণ ও অনুদানের কোন প্রয়োজন হবেনা বলে সংশ্লিষ্টগণ মনে করেন।