বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১১:২৯ অপরাহ্ন
Notice :
পরীক্ষামূলক আয়োজন চলছে। শীঘ্রই আসছি পূর্ণাঙ্গরূপে।

সাহিত্যের শব্দ-দৃশ্যায়ন রূপে উপস্থাপনা  প্রসঙ্গে

আতিকুর রহমান / ৬২ Time View
Update : শনিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৩

আমি মনে করি ইতিবাচক সৃজনশীল কর্মই শিল্প সাহিত্য। যে ফর্মেই হোক শিল্প সাহিত্য কর্মে অবশ্যই মানব কল্যানকামিতা থাকা আবশ্যক।মানব সমাজের চিন্তা চেতনার প্রসার ও জ্ঞান বিকাশের আবেদন থাকতে হয় শিল্প সাহিত্যে। অন্যদিকে শিল্প-সাহিত্য হচ্ছে সংস্কৃতির বাহন। সকল সম্প্রদায় জাতির চিন্তা চেতনা,বিশ্বাস,রুচিবোধ ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে তাদের নিজ নিজ শিল্প-সাহিত্য কর্মে। সকল জাতি সম্প্রদায় তাদের স্ব স্ব শিল্প কর্মের মাধ্যমে তাদের চিন্তা চেতনা,মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে। আর কোন জাতি সম্প্রদায়ের চিন্তা,চেতনা,বিশ্বাস,মূল্যবোধ,ঐতিহ্য,আচার আচরণ,রসনা,বসন ভূষণ সমগ্রই হচ্ছে সংস্কৃতি। আবার দেশ কাল ভেদে সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য থাকে। মতভেদ পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কেননা,সকলেরই স্বকীয়তা বা নিজস্বতা থাকে। তারপরও পৃথিবীর মানুষ বৈচিত্রের মধ্যে একত্ব অনুভব করে।
এবার নিবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় তথা শিল্প সাহিত্যের শব্দ-দৃশ্যায়ন রূপ বা অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্ম সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। শিল্প সাহিত্য চর্চার নানা ফর্ম আছে তথা নানা রূপে পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের কাছে উপস্থাপন করা যায়। প্রযুক্তির বিকাশ শিল্প সাহিত্য কর্মকে নানা ফর্মে উপস্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। এখন মুদ্রন মাধ্যমের শিল্প সাহিত্য কর্মকে একই সাথে অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে উপস্থাপন করা যাচ্ছে। উপন্যাস,লোকগাঁথা, ছোট গল্প, কবিতা,ছড়া কে অডিও-ভিস্যূয়াল মাধ্যমে নাট্য কলার মাধ্যমে উপস্থাপনের সুযোগ আছে। এমনকি ত্রিমাত্রিক এনিমেশন বা  কার্টুনের মাধ্যমেও উপস্থাপনের সুযোগ আছে। ইতিমধ্যে ভারত সহ বিভিন্ন দেশে সাহিত্য কর্মকে নাট্যকলার মাধ্যমে অডিও-ভিস্যূয়াল মিডিয়ায় উপস্থাপন করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ভারতে ধর্মীয় গ্রন্থ কে নাট্যকলার মাধ্যমে অডিও-ভিস্যূয়াল মিডিয়ায় উপস্থাপন করে সারা বিশ্বের শিল্পী সাহিত্যিকদের জন্যে অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যা সারা পৃথিবীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বলা আবশ্যক সকল ধর্মীয় গ্রন্থই উৎকৃষ্টতম তথা উচ্চ মার্গের  সাহিত্য।
ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলসমুহে এবং ইউটিউব সহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  বিভিন্ন ভাষায় নাট্যকলার মাধ্যমে ”মহাভারতের” উপস্থাপনা সত্যিই বিস্ময়কর। পাঠক কাগজে মুদ্রিত মহাভারত অধ্যয়নের স্থলে টিভি সিরিয়াল আকারে সম্প্রচারিত নাট্যকলার আশ্রয়ে অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে শৈল্পিক উপস্থাপনা দেখে শুনে অধিকতর আনন্দে মহাভারতের বাণী  রপ্ত করছেন। অন্যদিকে মহাভারত ভিত্তিক এনিমেশন ফিল্ম বা কার্টুন সিরিজ শিশুদের অসাধারন বিকল্প ডিজিটাল পাঠশালা। শিশুরা আনন্দের সাথে অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে মহাভারতের পাঠ রপ্ত করছে। মুদ্রিত গ্রন্থ পাঠের তুলনায় শিশুরা অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে পাঠদান দ্রুত রপ্ত করতে পারে।
অডিও-ভিস্যুয়াল মাধ্যম কালের স্রোতে  হারিয়ে যাওয়া পুরাতন সাহিত্য কর্মকে পুনরুজ্জীবিত করে আরো জনপ্রিয় করে তোলে। তার দৃষ্টান্ত ঠাকুর মা’র ঝুলি,গোপাল ভাড়ের মত শিশুতোষ গল্পসমুহ। কালের স্রোতে একরকম হারিয়ে যেতে বসেছিল গোপাল ভাড়,ঠাকুর মা’র ঝুলি’র মত শিশুতোষ গল্পসমুহ। কিন্ত  টিভি চ্যানেল,ইউটিউব সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে হারিয়ে যেতে বসা শিশুতোষ গল্পসমুহ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। ডিজিটাল ফর্মে এসে হয়েছে আরো জনপ্রিয়। টিভি চ্যানেল,ইউটিউব সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাট্যকলার আশ্রয়ে ত্রি-মাত্রিক এনিমেশনের মাধ্যমে গল্প চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। যা একই সাথে শিশুদের জন্যে শিক্ষাপ্রদ ও আনন্দপ্রদ।
গল্প,উপন্যাস অবলম্বনে স্বল্পদৈর্ঘ ও পূর্ণদৈর্ঘ চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। পদ্মা নদীর মাঝি” ”লালসালু” উপন্যাস  ভিত্তি করে ” পদ্মা নদীর মাঝি” ও ”লালসালু”  পূর্ণদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মানের মাধ্যমে ”পদ্মা নদীর মাঝি” ও ”লালসালু”  উপন্যাসটি আরো জনপ্রিয় হয়েছে। যারা ”পদ্মা নদীর মাঝি”  ও ”লালসালু” উপন্যাসটি পড়ার সুযোগ পাননি তারা চলচ্চিত্র দেখে উপন্যাসের বিষয়বস্তু অনুধাবন করতে পেরেছেন সহসাই। পুরাতন বাংলা সাহিত্যের অনেক বিখ্যাত উপন্যাসিক ও  সাহিত্যিকের এককালের পাঠকপ্রিয় গল্প,উপন্যাস সময়ের পরিক্রমায় লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এককালের আলোড়ন সৃষ্টিকারী গল্প,উপন্যাস সম্পর্কে অবগত নয়। কারন প্রকাশনা সংস্থাগুলো এই গল্প,উপন্যাসগুলো এখন আর মুদ্রন পরিবেশন করেনা। তারা সময়ের ট্রেন্ড নতুন লেখকদের বই প্রকাশে মনোনিবেশ করেছে। আবার বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যপুস্তকে রাজনৈতিক সহ নানা বিবেচনায় পুরাতন গল্প উপন্যাস বাদ দিয়ে নতুন লেখকদের গল্প উপন্যাস অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। যেখানে নাটক ও চলচ্চিত্র প্রডাকশন হাউসগুলো গল্প সংকটে আছে। মানসম্মত গল্প পাওয়া যাচ্ছে না। নির্মিত বেশিরভাগ নাটক চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তা পাচ্ছেনা। সেখানে প্রডাকশন হাউসগুলো কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া জনপ্রিয় গল্প উপন্যাস ভিত্তিক নাটক,স¦ল্পদৈর্ঘ ও পূর্ণদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মানের উদ্যেগ গ্রহন করতে পারে। বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভূক্ত ছিল ”নতুন সড়ক” ও পোড়া মাটির গন্ধ”। আশাকরি গল্প দু’টি ভিত্তিক খন্ড নাটক বা স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মিত হলে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করবে। পাঠকমন থেকে বিস্মৃতি হওয়া গল্পগুলো আবার ডিজিটাল ফর্মে এসে হাজির হবে। এমন শত শত গল্প আছে যা দিয়ে নাটক বা স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মান করা যায়। আবার ” পদ্মা নদীর মাঝি” ও ”লালসালু” এর মত অনেক উপন্যাস আছে যাকে ভিত্তি করে   পূর্ণদৈর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মান করা যেতে পারে। বোধকরি তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করবে।
অন্যদিকে নানা কারনে কাব্য সাহিত্য জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। প্রকাশকরা এখন আর কবিতার বই প্রকাশ করতে চায় না। আবার কবিতার বই খুব একটা বিক্রিও হয়না। এক্ষেত্রে কাব্য সাহিত্যের অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে উপস্থাপনা কবিতার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করতে পারে। কবিতা ও ছড়া  আবৃত্তির পাশাপাশি মডেলিং বা অভিনয় কলার মাধ্যমে অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে উপস্থাপনা খুবই জনপ্রিয় হতে পারে। আবার শিশুতোষ  কবিতা ছড়ার অভিনয় কলার আশ্রয়ে  ত্রিমাত্রিক এনিমেশন এর মাধ্যমে অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে উপস্থাপন করলে কবিতা ছড়ার হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে। ইতিমধ্যে স্বল্প পরিসরে হলেও কবিতা ছড়ার অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে উপস্থাপনা শুরু হয়েছে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ইসলাম সহ প্রখ্যাত কবিদের কবিতা ও ছড়া অডিও-ভিস্যুয়াল ফর্মে উপস্থাপনের উদ্যেগ গ্রহন করা উচিত। কেননা  এর বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও রয়েছে। যে কারনে  সংশ্লিষ্ট উদ্যেক্তাদের উপন্যাস,গল্প, কবিতা ও ছড়ার অডিও-ভিস্যুয়াল  ফর্মে উপস্থাপনা  তথা  ডিজিটাল প্রডাকশনের দিকে নজর দেয়া উচিত।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
এক ক্লিকে বিভাগের খবর