সরকারের পর্যটন মহাপরিকল্পনা

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২৫ বছর মেয়াদি একটি ‘পর্যটন মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়নন করতে যাচ্ছে সরকার। জাতীয় সংসদে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়, পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য ২৫ বছর মেয়াদি একটি ‘পর্যটন মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ এ পর্যটনকে উল্লেখযোগ্য শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি এবং দেশীয় ও বিদেশি পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পর্যটন শিল্পকে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও টেকসই করে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন সহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে হোটেল-মোটেল নির্মাণ বন্ধ করা, পর্যটকদের ভ্রমণ পর্যটন কেন্দ্রের ধারণক্ষমতার মধ্যে রাখা ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণের স্বার্থে স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে সরকার উদ্যোগ গ্রহন করেছে বলেও বাজেট বক্তৃতায় জানানো হয়।
এছাড়া পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন ও বিনোদন সুবিধা নিয়ে কক্সবাজারে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক তৈরি করা হচ্ছে বলেও বাজেট বক্তৃতায় জানান অর্থমন্ত্রী।
জাতীয় বাজেট ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্ত সংশ্লিষ্ট মহলের মতে চলতি বাজেটে পর্যটন খাতের বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। আবার পর্যটক স্বর্গ খ্যাত পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন স্পট অনুসন্ধান,উন্নয়ন ও সম্প্রসারনে উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ প্রকাশ পায়নি।
উল্লেখ্য,২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৫ লাখ কোটি টাকা। বিগত অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত অন্যান্য উৎস থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে বাজেটে বরাদ্দকে অপ্রতুল আখ্যায়িত করে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সম্মিলিত পর্যটন জোটের মতে পর্যটন খাতে বাজেটের পুরো আলোচনায় ছিলো বিমান, ট্রাভেল ট্যাক্স এবং ৫ তারকা হোটেলের আমদানি সুবিধা বাতিল। সেখানে পর্যটন খাতের বেসরকারি বিনিয়োগকৃত প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ সুরক্ষার বিষয় অবহেলিত হয়েছে। ৪৫ লক্ষ পর্যটন পেশাজীবির সুরক্ষা উপেক্ষিত, প্রান্তিক জনপদের পর্যটন উন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় উপেক্ষিত হয়েছে বলে জোট মনে করে। সম্মিলিত পর্যটন জোটের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে ২৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করার দাবি করা হয়েছিল। অপ্রদর্শিত অর্থ পর্যটন খাতে অবাধ বিনিয়োগের সুযোগ,পর্যটন শিল্পের জন্য শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ, পর্যটন রফতানিতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ ইনসেন্টিভ, পর্যটনের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে পুনরায় ভ্যাট ট্যাক্স নির্ধারণ, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ট্যুরিজম জোন এবং আন্তর্জাতিকমানের সুবিধা নিশ্চিতকরন,পর্যটন সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য রেশনিংসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিল জোট।
আসলে পর্যটন বর্তমানে সারা বিশ্বেই দ্রুত বিকাশমান একটি শিল্প। ত্বরিত বিকশিত এই শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ সহ অনেক দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। মালদ্বীপ সহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের প্রধান আয়ের খাত হচ্ছে পর্যটন শিল্প। অবশ্য অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি নিকট প্রতিবেশি ভারত,নেপালের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশ হতে পারে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পর্যটক গন্তব্য। বাংলাদেশের পর্যটন স্পটগুলো সাধারণত প্রাকৃতিক। কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট পর্যটন স্পট অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে খুবই কম। অবশ্য কৃত্রিম পর্যটন স্পট গড়ে তোলার মত সামর্থও বাংলাদেশের খুব একটা নেই। অবশ্য তার প্রয়োজনও নেই। এক্ষেত্রে প্রকৃতির দানই যথেষ্ট। আবার প্রাকৃতিক পর্যটন স্পটসমুহ রক্ষণাবেক্ষণ,উন্নয়ন,সম্প্রসারন যে খুব ব্যয়বহুল তা নয়। প্রয়োজন কেবল সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা। পর্যটক আকৃষ্ট করতে সক্ষম এমন মনোমুগ্ধকর আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিরল। একটানা ১২০ কিলোমিটার আয়তনের পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্র সৈকতের অবস্থান বাংলাদেশে। বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন তাও বাংলাদেশে। এক কথায় প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি বাংলাদেশ। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে বাংলাদেশকে পর্যটকদের ভ্রমণ পিপাসা মেটানোর জন্য অপরূপ রুপে সাজিয়ে রেখেছেন। পর্যটন শিল্প উদ্যোক্তাদের কৃত্রিম পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগের কোন প্রয়োজন নেই। প্রকৃতির দানের ওপর ব্যবসা বাণিজ্য করা যাচ্ছে অনায়াসে। যা অন্য কোন শিল্পে কল্পনাও করা যায় না।
এরপরও কিন্তু বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এখন পর্যন্ত কাংখিত লক্ষ্যে পৌছতে পারেনি।কেননা এ শিল্পের বিকাশে নানা অন্তরায় রয়েছে। প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয় অবকাঠামোগত অনুন্নয়ন ও আইন শৃংখলা পরিস্থিতি কে। কিন্তু আরেকটি অন্তরায় আছে যা প্রধানতম অন্তরায় না হলেও গুরুত্বপূর্ন। তা হচ্ছে প্রচার প্রচারনার অভাব। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বাস্তব পরিস্থিতি দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা পর্যটন শিল্পের বিকাশের অন্যতম শর্ত। প্রচারে প্রসার একথা পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক প্রচার। কেননা গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারের কারনে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিশে^র অনেক দেশ পর্যটক শূন্য। গণমাধ্যম কর্তৃক ”সন্ত্রাসী রাষ্ট্র” হিসেবে প্রচারিত হওয়ার কারনে প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি দর্শনে কোন পর্যটক যেতে আগ্রহবোধ করেনা। ঐ সকল রাষ্ট্রে ”সন্ত্রাসী” কার্যক্রম যতটা ছিল তার চেয়ে বেশি গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী লেবেল সেটে দেয়ার পরিণতি আজও উক্ত দেশের জনগণ ভোগ করতেছে। গণমাধ্য্যম যেমন নেতিবাচক লেবেল সেটে দিতে পারে তেমনি ইতিবাচক লেবেলও সেটে দিতে পারে। যার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে বহির্বিশে^ উল্লেখযোগ্য তেমন কোন নেতিবাচক প্রচারনা নেই।
দেশের পর্যটনের খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারনে সরকারের পর্যটন মহাপরিকল্পনা অবশ্যই এখাতের জন্যে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। তবে প্রত্যাশিত মাত্রায় নিয়ে যেতে হলে আরো বিস্তৃত,ইনোভেটিব ও সুদুর প্রসারি পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। সেন্টমার্টিন সহ সেনসেটিভ পর্যটন স্পটসমুহে ওভার টুরিজম রোধেও কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। আরবান টুরিজমের পাশাপাশি রুরাল টুরিজম বিকাশে সুদুর প্রসারি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহন করা জরুরি। পাবর্ত্য চট্টগ্রামে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা খুবই ব্যাপক। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের গন্তব্য হতে পারে পার্বত্য তিন জেলা। এজন্যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা।পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় থেকে পাহাড়ের সংযোগ স্থাপনে ক্যাবল কার স্থাপন এখন সময়ের দাবি। চালু করা প্রয়োজন হেলিকপ্টার টুরিজম। ক্যাবল কার ও হেলিকপ্টারিং চালু হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটকের ঢল নামবে নি:সন্দেহে। ক্যাবল কার স্থাপন ব্যয়বহুল বিধায় এটা সরকারকেই করতে হবে। হেলিকপ্টারিং যেকোন বেসরকারি সংস্থাই চালু করতে পারবে। আবার বিমান বাহিনী’র ব্যবস্থাপনায়ও চালু হতে পারে। সর্বোপরি,বিদেশি পর্যটক জোন স্থাপন জরুরি বিষয়। জোনে বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা,প্রমোদ,বিনোদন সহ সব কিছু নিশ্চিত করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।