জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের সমবায় ভাবনা

বিদ্রোহী কবি, বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়িত,বঞ্চিত মানুষের কবি এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য কর্মে গণ মানুষের মুক্তির কথা, মুক্তির পথ নির্দেশ নানা আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে। কবি তাঁর কবিতা, গানে, নাটকের মাধ্যমে বাতলিয়েছেন পথনির্দেশনা। কবির কন্ঠে সর্বদাই উচ্চারিত হত গণ মানুষের মু্ক্িতর কথা। অত্যাচারী শোষক শাসকের বিরুদ্ধে কবি আজীবন সোচ্চার ছিলেন। সমাজ, রাষ্ট্রের এবং মানুষের বাস্তবজীবন চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে কবির সাহিত্য কর্মে। বাস্তববাদী গণ মানুষের এই কবির ভাবনা থেকে সমবায় বিষয়টিও বাদ যায়নি। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কবির সমবায় ভাবনা পর্যালোচনা করা।
বিশ্বের নির্যাতিত, নিপিড়িত, অবহেলিত বঞ্চিত, দরিদ্র জনগনের স্বাবলম্বিতা অর্জনের মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে সমবায় পদ্ধতি। যে কারনে সমবায় পদ্ধতি টি কবির দৃষ্টি এড়ায়নি। কবি ১৪টি লাইন এবং প্রায় ৯০ শব্দের মাধ্যমে সমবায়ের মূলমন্ত্র তুলে ধরেছেন। যার ব্যাখ্যা কয়েক হাজার শব্দেও করা যাবেনা। কবি বলেছেন “ ওরে নিপীড়িত, ওরে ভয়ে ভীত, শিখে যা আয়রে আয়। দুঃখ জয়ের নবীনমন্ত্র সমবায়, সমবায়”।
কবি এখানে বিশ্বের নিপীড়িত বঞ্চিত মানুষদের আহবান জানিয়েছেন দুঃখ জয় করার পদ্ধতি শিখে নেয়ার জন্য। আর এই পদ্ধতি হিসাবে উপস্থান করেছেন সমবায় কে। কেননা, বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ যদি সমবায়ের ছায়াতলে একত্রিত হয়ে পথ চলতে পারে তাহলে আর মহাজন শোষক গোষ্ঠী তাদের শোষন করতে পারবেনা। পরবর্তী পংক্তিদ্বয়ে কবি বলেছেন “ক্ষুধায় জ্বলিয়া মরেছি, সুধার কলস থাকিতে ঘরে। দারিদ্র ঋণ অভাবে মরেছি, না চিনে পরস্পরে” মানুষের হাতের কাছে অবলম্বন থাকা সত্ত্বেও খুঁজে পায়না। যে কারনে দারিদ্র ক্ষুধা তাঁর নিত্য সঙ্গী। আর গরীব জন-সাধারনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের কোন ব্যবস্থাও নেই। অথচ আমরা গরীব সকলে পরস্পর মিলিত হয়ে সমবায় গঠন করতে পারি তাহলে আমরা নিজেরাই নিজেদের ঋণের ব্যবস্থা করতে পারি। নিজেদের মুক্তির পথ খুঁজে বের করতে পারি। তাহলে ক্ষুধা দারিদ্র আমরা দূর করতে পারি। উপরোক্ত চরনে কবি এই কথাই বুঝাতে চেয়েছেন।
“মিলিত হইনি, তাই দুর্গতি ঘরে ঘরে, সেই দুর্গতি দুর্গ ভাংগিব সমবেত পদঘায়”- বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত, দরিদ্র, বঞ্চিত মানুষ সমবেত নয় বলেই মহাজন শোষক গোষ্ঠী তাদের শোষণ করার সুযোগ পায়। “ভাগ কর শাসন কর” নীতি প্রয়োগ করার সুযোগ পায়। যে কারণে আমাদের সমবায়ের ছায়াতলে সমবেত হয়ে এই দুর্গতির অবসান ঘটাতে পারে। এখানে কবি এই আহ্বানই জানিয়েছেন।
“মিলি পরমানু পর্বত হয়, সিন্ধু বিন্দু মিলে, মানুষ শুধুই মিলিবে না কিরে মিলনের এ নিখিলে”- ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালু কনা সমবেত হয়ে যেভাবে মরুভূমির সৃষ্টি করে। আবার বিন্দু বিন্দু জল পড়তে পড়তে এক সময় মহাসাগরের সৃষ্টি হয়। তেমনি মানুষও সমবেত হয়ে বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে। বিশ্বে যেভাবে বিশালকারে কর্পোরেট হাউস গড়ে উঠছে তাতে বিশ্বের মোট সম্পদের অধিকাংশই কয়েকটি বন্ধুজাতিক কোম্পানীর হাতে পুঞ্জিভূত। অথচ বিশ্বের দরিদ্র মানুষ যদি সমবায়ের নীতি আদর্শে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমবায় সমিতি গড়ে তোলে তাহলে তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুঁজি একত্রিত করে বিশালাকারের পুঁজি গঠন করতে পারে। তারাও গড়ে তুলতে পারে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। যা বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সমান্তরাল হতে পারে। যা হবে ভোগবাদী, পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার সামনে চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। কিন্তু মানুষ পৃথক ভাবে চলার কারনে এধরনের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। কিন্তু কেন? যদি বালুকনা সমবেত হয়ে মরুভূমি তৈরি করতে পারে আর বিন্দু জল সমবেত হয়ে মহাসাগর সৃষ্টি করতে পারে তাহলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষ কেন সমবেত হতে পারবে না- এইখানে এটাই কবির প্রশ্ন।
“জগতে ছড়ানো বিপুল শক্তি কুড়াইয়া তিলে তিলে, আমরা গড়ির নতুন পৃথিবী সমবেত মহিমায়” – সারা বিশ্বে বহু সম্পদ বিচ্ছিন্নভাবে আছে। আবার বিশ্বের নানা শ্রেনীর মানুষের মধ্যে প্রতিভা লুকায়িত আছে। এই সম্পদ ও প্রতিভার যদি সম্মিলন ঘটে তাহলে আমরা একটা সমৃদ্ধশালী নতুন বিশ্ব গড়ে তুলতে পারবো। আর যার মোক্ষম পন্থা হচ্ছে সমবায়। কবি এখানে সমবায়ের মাধ্যমে একটি নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন।
“দুর্ভিক্ষের শোষনের আর পেষনের যাঁতাকলে , এক হইনি বলিয়া আমরা মরিয়াছি পলে পলে”-
দারিদ্র মানুষের দুর্ভিক্ষ বারমাস। শোষন আর পেষনে যাঁতাকল যেন তাদের ভাগ্যের লিখন। এই নির্যাতন, শোষনের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করতে শেখেনি। তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। জন সাধারনের অনৈক্যের সুযোগেই শোষক গোষ্ঠী শোষনের সুযোগ পায়। অথচ জনসাধারন সমবেত হলে এই শোষন বঞ্চনার অবসান ঘটতে পারে। উপরোক্ত পক্তিদ্বয়ে কবি এ কথাই বুঝাতে চেয়েছেন। শেষ চরনদ্বয়ে কবি বলেছেন – “ সকল দেশের সকল মানুষ আছি সহস্র দলে, মিলিয়াছি তাই রবে না জগতে সবলের অন্যায়” যথার্থ মন্তব্য। দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল দেশের সব মানুষ একত্রিত হয়ে সমবায়ের ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হলে পুঁজিবাদের ধারক বাহক কর্পোরেট হাউস মহাজন গোষ্ঠী বা কোন শাসক গোষ্ঠীই আর শোষন করতে পারবে না।
দরিদ্র মানুষের মুক্তির হাতিয়ার হিসাবে সমবায়ের কার্যকারিতা ইতিবাধ্যে বিশ্বে প্রমানিত হয়েছে। তবে কবি এখানে কেবল সমবায় সমিতি গঠনের কথাই নয় সকল ক্ষেত্রেই জন সাধারনের ঐক্যবদ্ধ ও সমবেত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সংক্ষেপে কবি সমবায়ের নীতি, আদর্শ লক্ষ্য উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন। চৌদ্দ চরনের এই কবিতা বা গানটি এখন সমবায় সংগীত হিসাবে বাংলাদেশে গীত হয়। আন্তর্জাতিক সমবায় মৈত্রী (আইসিএ) এর মাধ্যমে এই গানটি কে আন্তর্জাতিকভাবে সমবায় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। ইংরেজী সহ অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের উদ্যোগ নেয়াও প্রয়োজন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম